প্রকাশিত: ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ১১:৩৯ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
ডা. মনজুর এ খোদা
বাংলাদেশে ২০ কোটি জনসংখ্যা তার মধ্যে ভোটার সংখ্যা ১৩ কোটি। আর তাই স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে শুধু ভোটারের সাথে সংযুক্ত না এটা সবার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সেবা জরুরী। এবং সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল্ড(এসডিজি) এর ২০৩০ সালের যে লক্ষ্যমাত্রা আছে,তাতে ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) বাধ্যতামূলক। পৃথিবীব্যাপী যে চারটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মডেল আছে তার মধ্যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সবচেয়ে দুর্বলতম স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। যেমন দেখা যাচ্ছে, চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যয়বহন সমস্ত কিছু জনগণের করতে হচ্ছে সরকারের বা রাষ্ট্রের কোন দায়িত্ব বা ভূমিকা থাকছে না। বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা (সংক্ষেপে):
• ব্যবস্থা: আংশিক সরকারি + অধিকাংশ ব্যক্তিগত
• সরকারি হাসপাতাল আছে, কিন্তু: ডাক্তার ও নার্স সংকট
• ওষুধ ও যন্ত্রপাতির অভাব
• দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা
• বাস্তবে ৬০–৭০% মানুষ নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে চিকিৎসা নেয়,
• স্বাস্থ্য বীমা প্রায় নেই বললেই চলে
• বিদ্যমান ব্যবস্থা চায় মানুষের রোগের মাত্রা বৃদ্ধি হোক, অধিক রোগি- অধিক স্বাস্থ্য উপকরন ও সেবা প্রদান বানিজ্য। তাই প্রতিরোধ ও জীবনযাত্রার শুদ্ধ চর্চার গুরুত্ব খুব কম।
👉 ফলাফল: দরিদ্র মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে আরও দরিদ্র হয়ে যায়।
একটা কল্যাণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব থাকে, যে প্রত্যেক নাগরিকের স্বাস্থ্য সেবা ও স্বাস্থ্য তথ্য সুরক্ষা(ডেটা সেফটি) সুনিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য বীমার দায়িত্ব। এবং একজন নাগরিকের ও দায়িত্ব রয়েছে স্বাস্থ্য সেবা পেতে স্বাস্থ্যবীমা করা ও কর দেয়া। বাংলাদেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সংখ্যা থেকে শুরু করে সামর্থ্যবান জনগোষ্ঠী সবাই নিজ দায়িত্বে স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করে থাকেন। সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে আর্থিকভাবে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করে থাকেন আবার দরিদ্র জনগোষ্ঠী আর্থিক চাপে অনেকেই স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশে আরও একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, "ইউনিক হেল্থ আইডি" না থাকায়। যেমন একজন রোগী যখন স্বাস্থ্যসেবার সম্মুখীন হন তখন ঠিক সেই মুহূর্তে তার অতীতের মেডিকেল রেকর্ডগুলো ঠিকমতো পাওয়া যায় না বা সংরক্ষিত থাকে না, আর পাওয়া গেলেও বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। এবং একেক মেডিকেল একেক সফটওয়্যার দ্বারা তাদের মেডিকেল রিপোর্টগুলো সংরক্ষিত করে থাকেন। কিন্তু কোনো কেন্দ্রীভূত সার্ভার নেই সেই ক্ষেত্রে অনেক সময় মেডিকেল রেকর্ড গুলো অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। এবং মেডিকেল রেকর্ড গুলোতে কোন স্বয়ংক্রিয়তা নেই,এবং মেডিকেল রেকর্ড যদি ডিজিটাল EMR সার্ভার (সিভিল ও মিলিটারির জন্য পৃথক ইএমআর) অর্থাৎ ইলেকট্রোনিক মেডিকেল রেকর্ড হিসেবে না থাকে, সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বীমার সুবিধা যদি চালু হয় তাহলে সেটি সম্ভব হয় না।
আর তাই আমাদের দরকার বৈশ্বিক বিভিন্ন দেশে উন্নত রাষ্ট্র,স্বল্প উন্নত বা মধ্য উন্নত রাষ্ট্রে যে দেশগুলো আছে সেগুলোতে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা মডেল চালু আছে। এবং অতি উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বহন করে থাকে। সেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বেভারিজ মডেল বলা হয়ে থাকে। এবং আরো কিছু উন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্য বীমার মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে থাকে প্রাইভেট বীমা কেনার মাধ্যমে,কিন্তু সরকার সরাসরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে না তবে সরকার শুধু দেখে প্রাইভেট বীমা গুলো মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা দিচ্ছে কিনা। আরো কিছু দেশে আরো একটি ব্যবস্থা চালু আছে সেটি হচ্ছে মিক্সড যেমন ন্যাশনাল হেলথ ইন্সুরেন্স মডেল সেটি হলো বাংলাদেশ বা মধ্য উন্নত রাষ্ট্রের জন্য যেখানে ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন বা বাজেট স্বল্পতা থাকে সেক্ষেত্রে মধ্যউন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশের ক্ষেত্রে সরকার নিজে একটি অংশে প্রিমিয়াম বা ভর্তুকি দিবে, ব্যক্তি নিজে দিবে এবং যারা চাকরি দাতা যেমন মানুষ যে কোম্পানি বা যে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকে সে কোম্পানি একটি অংশ বহন করবে। তাহলে এভাবে মিক্সড স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম হবে। এবং এটি একটা ইউনিক হেলথ আইডি সিস্টেমের মাধ্যমে চালু হবে এবং এক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক মেডিকেল রিপোর্ট রেকর্ড টি সংরক্ষিত থাকবে। এবং যে যেখানেই স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করুক না কেন সেখানে ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড বা অতীতের যে কোন স্বাস্থ্য রেকর্ড সমস্ত কিছু দেখা সম্ভব হবে।
আরেক দিকে শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্ক দের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে যে বিষয়গুলো প্রযোজ্য হবে। একটি শিশু মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই স্বাস্থ্য সেবার প্রয়োজন হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে (বিআরএন- জন্মনিবন্ধন) নামের একটি সার্ভার আছে। আর তাই সবার যদি ইউনিক হেলথ আইডি হয়ে থাকে সেই ক্ষেত্রে ইউনিক হেলথ আইডিটা পাইলটিং হয়ে ধাপে ধাপে পর্যায়ক্রমে চালু হবে। আর এই ইউনিক হেলথ আইডি চারটি সার্ভারের সাথে সংযুক্ত থাকবে। যেমন বিআরএন(জন্মনিবন্ধন) সার্ভার, এনআইডি সার্ভার, (এনবিআর) বা ট্যাক্স সার্ভার, আরেকটি হল হেলথ ইন্সুরেন্স সার্ভার। আর তাই কোন ব্যক্তিই ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ থেকে বাদ যাবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যারা দরিদ্র বা বেকার তাদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করতে সরকার সক্ষম হবে। আর যারা সর্বনিম্ন জিরো রিটার্ন ট্যাক্স থেকে শুরু করে যত উচ্চ মাত্রার কর দেন এবং যারা বৃহৎ সংখ্যক কর দেন, তাদের প্রিমিয়াম বা কর থেকে যে আয় হবে সেখান থেকেই সরকার প্রত্যেক নাগরিককে বিমা ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব। এখানে বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র সূচক থেকে সর্বশেষ তথ্যানুযায়ি,
যেসব পরিবার দারিদ্র সীমার নিচে তাদের জন্য সকল জরুরি ও নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা(ডাক্তার দেখানো, টেস্ট, ওষুধ, সার্জারি ও বিশেষায়িত চিকিতসাঃ ক্যান্সার চিকিৎসা, হৃদরোগ, অঙ্গ প্রতিস্থাপন) সম্পূর্ণ ফ্রি,
এরপর দারিদ্র সীমা থেকে মধ্য আয়ের জনগন সকল জরুরি/জীবনরক্ষাকারি সেবা পূর্ন ভর্তুকি/ Subsidy ( ডাক্তার দেখানা, টেস্ট, ও বিশেষায়িত চিকিতসাঃ ক্যান্সার চিকিৎসা, হৃদরোগ, অঙ্গ প্রতিস্থাপন) ও অন্যান্য নিয়মিত চিকিৎসা সেবা(ওষুধ ও সার্জারি) আংশিক ভর্তুকি(৫০-৭০%) প্রদান এবং বাকিটা সেবা গ্রহীতা নিজে দেবেন
উচ্চমধ্য থেকে বাকি সবাই ন্যাশনাল হেলথ ইন্সুরেন্স মডেলে শেয়ার্ড প্রিমিয়াম দিবে। এই প্রিমিয়াম এর একটি অংশ সরকার দিবে, একটি অংশ ব্যক্তি নিজে দিবে, আরেকটি অংশ ব্যক্তি যে প্রতিষ্ঠানে থাকে সে চাকুরীদাতা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি দিবে।
পাইলট প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রথমত সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট করতে হবে। সংসদে ডাটা সেফটী আইন পাশ পূর্বক প্রত্যেক নাগরিক যাতে ইউনিক হেলথ আইডি তৈরি করতে পারে। আরেক দিকে সিস্টেম অনুযায়ী বিআরএন সার্ভার, এনআইডি সার্ভার, এনবিআর সার্ভার আর হেলথ ইন্সুরেন্স সার্ভার এই সার্ভার গুলি কে কেন্দ্রীভূত একটি প্লাটফর্মে সফটওয়্যার ভিত্তিক সক্রিয় করা। এটি অটোমেশন করা হলে ছয় মাসের মধ্যে কার্যক্রম পাইলট চালু করা সম্ভব এবং দুই বছরের মধ্যেই জনগোষ্ঠির প্রায় অর্ধেক এর আওতাভুক্ত করা সম্ভব।
আমাদের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের একটি বড় অংশ হচ্ছে বাস্তবিক সেট আপ যা স্বাস্থ্য কাঠামো তৈরি করে বা প্রযুক্তি মেশিনারিজ ইকুইভমেন্টস। এগুলোর ক্ষেত্রে যদি ওপেন টেন্ডারিং(AI-ভিত্তিক টেন্ডারিং) সিস্টেম থাকে সফটওয়্যার এর মাধ্যমে সে ক্ষেত্রে এখানে স্বাস্থ্য প্রশাসনের কোন ব্যক্তি ক্রয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে না ফলে সেখানে অর্থনৈতিক কোন সম্পর্ক থাকার সুযোগ নেই বললেই চলে। সে ক্ষেত্রে যে কোন ফ্যাসিলিটির একটি ফ্যাসিলিটি আইডি থাকে যেমন কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা মেডিকেল কলেজ, আর সেই ফেসিলিটি আইডি থেকে যদি চাহিদা পত্র প্রেরণ করা হয় সেখানে কি ধরনের চাহিদা প্রেরণ করা হয়েছে তা অটোমেশন এর মাধ্যমে বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্ট দ্বারা করা সম্ভব (সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্য ভেঙে যাবে)। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে পদ্ধতি আছে যদি উচ্চ ব্যয় সম্পন্ন প্রযুক্তি ক্রয় হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে, আর যদি নিম্ন বা মধ্যবর্তী বাজেটের হয়ে থাকে হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে আমাদের যে লোকাল পদ্ধতি আছে যেগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ওটিএম পদ্ধতি। এই পদ্ধতি বর্তমানে বিদ্যমান আছে।
কিন্তু সেখানে কিছু প্রসেসিং সম্পন্ন হয় এবং যখন সিলেক্টিং এর প্রশ্ন আসে সেই জায়গায় কিছু অটোমেশনের ঘাটতি আছে সেখানে একটি ব্যক্তির মতামত দেওয়ার জায়গা আছে , আর এখানে ব্যক্তির মতামত দেওয়ার জায়গায় যদি এলগরিদম এর মাধ্যমে অটোমেশন করা হয়। সে ক্ষেত্রে মানসম্মত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা হবে যেমন যে ব্যয়ের যে মানসম্মত ব্যবস্থা বা মেশিনারিজ সেটিই ক্রয় করা সম্ভব হবে। এবং সেটির যে সাপ্লাইটি সেটি সঠিক সময় ডেলিভারি করা সম্ভব হবে। এবং সে ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী ভাবে সরকারি ফেসিলিটির ইকুইপমেন্টস গুলো অনেক সময় নির্দিষ্ট নিয়মের বাইরে অকার্যকর থাকার যে প্রবণতা আছে সে ক্ষেত্রে সেটিও বন্ধ হবে।
বাংলাদেশের মতো অনেক রাষ্ট্রে ট্রিপস যুক্তির মাধ্যমে ঔষধ দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে যদি মানুষকে বীমা সুবিধার আওতায় আনা হয় , চিকিৎসার ক্ষেত্রে ওষুধের মানসম্পন্ন বিতরন রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে এত ফার্মাসিউটিক্যাল নেই কিন্তু বাংলাদেশে প্রায় ২৫০টির ও অধিক ফার্মাসিউটিক্যাল।এর মধ্যে মানসম্মত থেকে শুরু করে মধ্যমানসম্মত ও নিম্নমানসম্মত ফার্মাসিউটিক্যাল রয়েছে।
এবং এগুলোর মধ্যে অনেক মেডিসিন কোম্পানি আছে নাম মাত্র সেসব ফার্মাসিউটিক্যাল এর ওষুধ খেলে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি হয় বেশি। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বীমা সুবিধা(National Health Insurance Model) যদি চালু হয় বীমা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে তবে ওটিসি(Over The Counter) ঔষধ বাদে তখন কোনো রোগীর সরাসরি ফার্মেসিতে গিয়ে প্রেসক্রিপশন নিয়ে ওষুধ কেনার প্রয়োজন হবে না। তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই সার্ভার এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট ফার্মেসিতে প্রেসক্রিপশন পৌঁছাবে, শুধুমাত্র মানসম্মত ঔষধ প্রচলিত থাকবে। এবং সেই মানসম্মত ঔষধ যেহেতু সরকার ক্রয় করবে সেহেতু দেখেশুনে ভালো মানের মানসম্মত ঔষধ ক্রয় করবে সরকার।
বৈদেশিক যে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো আছে সেগুলোকে বিনিয়োগে আগ্রহী করে গড়ে তোলা যেতে পারে। এবং যেহেতু আমাদের সম্ভাবনার সুযোগ হয়েছে সে ক্ষেত্রে দেশীয় মানুষ উন্নত প্রযুক্তির বৈদেশিক ঔষধ তারা স্বল্প মূল্যে পাবে এবং বাংলাদেশ থেকে ঐসব কোম্পানিগুলোও ঔষধ রপ্তানির সুযোগ পাবে। সে ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলক কম পারিশ্রমিক, BIDA এর বিনিয়োগ বান্ধব সিস্টেম ও কর মুক্ত সীমা থাকলে সেক্ষেত্রে মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো এখানে ফ্যাক্টরি স্থাপন করবে ও প্রতিযোগিতায়নের ফলে দেশি কোম্পানিগুলোর মান উন্নয়ন করা সম্ভব হয় সে ক্ষেত্রে একই মানদণ্ডে থাকবে এবং ওষুধ বিতরন করবে সরকার ও বীমার সমন্বিত সিস্টেম। আর তাই সরাসরি কোন নিম্নমান সম্পন্ন ঔষধ দোকান থেকে বিক্রি করার কোন সুযোগ থাকবে না ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যদি ইউএইচআইডি(UHID) থাকে তাহলে চিকিৎসা প্রদানকারী হোক কিংবা প্রাইভেট সেবাদানকারী হোক না কেন, সেখানে যাওয়ার পরে যখন প্রবেশ করবে তখন অহেতুক যে রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন চেকআপ থাকে যেমন একই চেক বারবার করানোর প্রবণতা থাকে বা কখনো কখনো প্রয়োজন হয়, কারণ চিকিৎসকদের কিন্তু প্রমাণ সাপেক্ষে চিকিৎসা দিতে হয় । আর যদি রোগী পর্যাপ্ত ডকুমেন্ট হাজির করতে না পারে এবং চিকিৎসকের ও নিরাপত্তার বিষয় থাকে এবং সবকিছুর মেডিকেল প্রমাণ সাপেক্ষে চিকিৎসা দিতে হয়। আর তার তাই টেস্ট প্রয়োজন না থাকলেও তখন বাধ্যতামূলক ভাবে করতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, যদি রেকর্ডটা সুরক্ষিত হয় তাহলে দেখা যায় যে অতীতে রোগী কি ধরনের চেকআপ করেছে বা কি ধরনের ঔষধ খেয়েছে ও রোগ নির্ণয়ে আদৌ হয়েছে কিনা তাহলে সহজেই রোগী সঠিক চিকিৎসা পেয়ে থাকবে। যেমন উদাহরণস্বরুপ কোন রোগী ঢাকার বাসিন্দা এবং সে কোন কারণে কক্সবাজার গিয়েছে আর সেই মুহূর্তে তার হঠাৎ তার হার্ট অ্যাটাক হলো আর সেই মুহূর্তে কক্সবাজারে কোন মেডিকেল কাগজ নেই কিন্তু রোগী মেডিকেলে উপস্থিত হওয়ার পরই সার্ভারের মাধ্যমে রোগীর মেডিকেল রেকর্ড গুলা জানবেই এবং সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। এবং রোগী বীমার আওতাধীন থাকলে অবশ্যই তার সাথে বীমার কার্ড সাথে থাকবেই আর সেই বীমার কার্ড প্রদান করার সাথে সাথেই ইমারজেন্সি সেবা দিয়ে থাকবে। এবং প্রিমিয়াম ও ট্যাক্স প্রদান করার কারণে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পাবে ইমারজেন্সি চিকিৎসা। এবং যদি উচ্চতর যা চিকিৎসার প্রয়োজন হয় পরবর্তীতে তা রেফারেল সেন্টারে পাঠানো হবে যেমন হার্টের রিং পরানোর বা বাইপাস লাগে সেগুলো পরবর্তীতে বীমা সুবিধার আওতায় সম্পূর্ণ বিনিয়োগে বা আংশিক খরচে করা সম্ভব।
আমাদের যে কল্যাণ রাষ্ট্রগুলো(এগালিটারিয়ান) আছে যেমন ব্রিটেন বা উত্তর ইউরোপে সুইডেন, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড সেখানে তুলনামূলকভাবে জনসংখ্যা কম এবং সম্পদ এর মাত্রা অনেক বেশি সেখানে সরকার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পূর্ণ দায়িত্ব নেয়(Beveridge Model)। এমনকি এখানে বীমা করার প্রয়োজন হয় না, সেখানে সাধারণ জ্বর থেকে শুরু করে উচ্চতর রোগ ক্যান্সার, কেমোথেরাপি এর মত রোগের চিকিৎসাও সবকিছুই সরকারি ব্যয়ে হয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশের জন্য এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রযোজ্য করা সম্ভব নয়। কারণ এখানে বিশাল জনগোষ্ঠী যার কারণে স্বাস্থ্যখাতে ব্যায় বহুল খরচ হবে।
তবে আরেকটি মডেল আছে অন্যান্য দেশে যেমন জার্মানি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, জাপান, ব্রাজিল, মেক্সিকোতে যে মডেলটি চালু আছে এখানে সরকার কোন দায় নেয় না তবে তারা যেটা করে বিভিন্ন ধরনের ইনস্যুরেন্স কোম্পানি গুলো থাকে সে কোম্পানিগুলো সিকনেস ফান্ড থাকে সেই প্যাকেজগুলো সেই জনগোষ্ঠী ও চাকরিদাতা কিনে নেয় ও তারা প্রিমিয়াম প্রদান(Pay-Roll) করে। এবং এই প্রিমিয়াম গুলো যারা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকে তারাও সে প্রিমিয়াম এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে । সে ক্ষেত্রে সেটি হচ্ছে প্রিমিয়াম ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা(Bismarck Model)। আর তাই উন্নত মানের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা সম্ভব হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যায় যে, শুধুমাত্র যদি প্রাইভেট স্বাস্থ্য বীমা কে এককভাবে অনুমতি দেয়া হয় সে ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে ও চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেড়ে যেতে পারে ।
তৃতীয় যে আরেকটি মডেল আছে যেমন আমেরিকার মেডিকেয়ার পদ্ধতি, দক্ষিন কোরিয়া, তাইওয়ান, কানাডা সেটি হচ্ছে মিক্সড মডেল সেটা হল ন্যাশনাল হেলথ ইন্সুরেন্স মডেল । এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো পন্থা । এখানে যারা দরিদ্র, বেকার ও অবসরপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী(কর সীমার নিচের জনগোষ্ঠী) তাদেরকে পূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা সরকার পূর্ণ ভর্তুকি বা ফ্রি দিবে। কারণ সবার কাছ থেকেই সরকার প্রিমিয়াম ও কর পাচ্ছে। এবং একজন নাগরিক যখন সুনিশ্চিত হবে তার স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণে সরকার ন্যায্য ভূমিকা রাখছে তখন একজন নাগরিক প্রিমিয়াম বা কর দিতে ফাঁকি দিবেনা।
এবং যারা অন্যান্য স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণকারী যেমন দরিদ্র ও বেকার জনগোষ্ঠীর বাহিরে তারা শেয়ার্ড প্রিমিয়াম দিবে। এই প্রিমিয়াম এর একটি অংশ সরকার দিবে, একটি অংশ ব্যক্তি নিজে দিবে, আরেকটি অংশ ব্যক্তি যে প্রতিষ্ঠানে থাকে সে চাকুরীদাতা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি দিবে। এভাবে ৩ অংশে ভাগ হলে সবার ক্ষেত্রে ব্যয়ভার টা কমে আসবে এবং চিকিৎসা সেবা ১০০% সুনিশ্চিত হবে । আর এটি ইউএইচআইডি ভিত্তিক হবে এবং যারা কর বা প্রিমিয়াম দিতে অনিচ্ছুক সেক্ষেত্রে অবশ্যই সে সেবার বাইরে চলে যাবে।
সাধারণত কেউই স্বাস্থ্য সেবার কভারেজের বাইরে যেতে চাইবেন না। এটিই বাংলাদেশ এর জন্য প্রযোজ্য। বাংলাদেশে এখন যেমন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালু আছে এসব হচ্ছে আউট অফ পকেট সেবা এবং চিকিৎসার সব ব্যয় ব্যক্তি নিজেকে বহন করতে হচ্ছে। এবং দেখা যাচ্ছে নিম্নমানের সেবা অনেক উচ্চ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে এবং যার সামর্থ্য নাই তার জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে যেমন ক্যান্সারের সেবা, সার্জারি এর সেবা এবং জটিল হার্ট অ্যাটাক এর চিকিৎসা পাওয়া হচ্ছে না অর্থ না থাকায়।
প্রস্তাবিত বাংলাদেশ মডেল (বাস্তবসম্মত):
🔹 ১. বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য বীমা
• চাকরিজীবী: সবার হেলথ ইনস্যুরেন্স কার্ড থাকবে(UHID, NID, BRN, NBR Sync করা)
কর্মী + মালিক + রাষ্ট্র → সবাই মিলে বীমা দেবে
• দরিদ্র ও বেকার: রাষ্ট্র পুরো বীমা দেবে
🔹 ২. সরকারি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করাঃ
• স্বাস্থ্য তথ্য সুরক্ষা(ডেটা সেফটি) সুনিশ্চিত করা
• ডিজিটাল EMR সার্ভার (সিভিল ও মিলিটারির জন্য পৃথক)
• জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে:
ডাক্তার, নার্স বাড়ানো
• মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিত করা
• সরকারি হাসপাতাল হবে বীমা গ্রহণকারী প্রধান কেন্দ্র
🔹 ৩. বেসরকারি হাসপাতালকে নিয়ন্ত্রণে আনা
• বীমা কার্ড থাকলে:
নির্ধারিত দামে চিকিৎসা
• অতিরিক্ত বিল আদায় বন্ধ
🔹 ৪. প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসায় জোর
• কৃষি দূষণ, খাদ্য দূষণ ও পরিবেশ দূষণ রোধ এবং রোগ সৃষ্টীর উৎস বন্ধ করা, এতে বীমা ভর্তুকি কম লাগবে, কারন রোগি কমে যাবে। সরকার নিজ দায়িত্বে আন্তঃ মন্ত্রনালয় সমন্বিত কার্যক্রম করবে কারন রোগ কম- স্বাস্থ্য বীমা ভর্তুকির অপচয় কম।
• ফ্রি টিকা
• নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
• মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা
• মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত
৫. এর ফল কী হবে?
• কেউ চিকিৎসার অভাবে মরবে না
• দরিদ্র মানুষ ঋণ করে চিকিৎসা নেবে না
• সবার স্বাস্থ্য তথ্য সুরক্ষিত থাকবে
• স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি কমবে
• জনগণ বেশি সুস্থ → দেশ বেশি উৎপাদনশীল
• বেভারিজ মডেলের মতো ব্যয়বহুল নয়
• প্রাইভেট মডেলের মতো নিয়ন্ত্রণহীন নয়
৬. বাস্তবায়ন সময়সীমা?
ছয় মাসে পাইলট, দুই বছরে অর্ধেক জনগণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সফটওয়্যার ও সার্ভার সংযুক্ত করে ৬ মাসে পাইলট প্রকল্প এবং ২ বছরে দেশের অন্তত ৫০% জনগণকে এর আওতায় আনা সম্ভব।
এক লাইনে উপসংহার:
বাংলাদেশের জন্য ধাপে ধাপে “ডাটা সেফটী আইন পাশ পূর্বক ইউনিক হেলথ আইডি + বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবীমা + ডিজিটাল (EMR সার্ভার- সিভিল ও মিলিটারির জন্য পৃথক) ও AI-ভিত্তিক টেন্ডারিং) ও শক্তিশালী সরকারি হাসপাতাল + মানসম্মত ওষুধ” মডেলই সবচেয়ে বাস্তব ও কার্যকর
ইউনিক হেলথ আইডি (UHID)এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশে আর কেউ
“টাকা না থাকায় চিকিৎসা পায়নি” — এই বাক্যটি বলবে না।
এবং ডিজিটাল আইডি, বীমা, ট্যাক্স, হাসপাতাল ও ওষুধ শিল্প একত্রে কাজ করবে।
লিখেছেন- ডা. মন্জুর এ খোদা
এমবিবিএস(আর ইউ), এমআরসিপি(লন্ডন, ইউ্কে)
ইউলার ইসিআরডি ইন রিউমাটোলজি, সুইজারল্যান্ড।
এম এ সি পি(ইউ এস এ), ডিপ্লোমা অফ আমেরিকান বোর্ড অফ রিজেনারেটিভ মেডিসিন (এবিআরএম, ইউ এস এ)
ইন্টারভেনশনাল রিউমাটোলজি(বাত) বিশেষজ্ঞ ও স্টেমসেল বিশেষজ্ঞ
কনসালটেন্ট ইন্টারভেনশনাল রিউমাটোলজিস্ট, পপুলার ডায়াগনস্টিকস, শান্তিনগর, ঢাকা ।
চেয়ারম্যান, রিজেনেক্স পেইন সল্যুশন বাংলাদেশ (বাত-ব্যথা ও অটোইমিউন রোগের চিকিতসায় একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান)
মন্তব্য করুন