প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ০৫:৫৭ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

বিভাগীয় পরীক্ষা বন্ধ রেখে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ; আলোচনায় অঞ্চল-১০ এর এক কর্মচারী

আয়কর বিভাগে পদোন্নতি বঞ্চনা, সিন্ডিকেট ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর অনুবিভাগে ১১তম থেকে ১৬তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বঞ্চনা, সিন্ডিকেট চক্র ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই পদে কর্মরত থেকেও তারা ন্যায্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেকেই পুরো চাকরি জীবনে মাত্র একবার পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কেউ কেউ অবসরে গিয়েছেন কোনো পদোন্নতি ছাড়াই।

ভুক্তভোগীদের দাবি, একদিকে বিভাগীয় ক্যাডার কর্মকর্তাদের একটি অংশ অধস্তন কর্মচারীদের পদোন্নতি প্রক্রিয়া জটিল করে রেখেছেন, অন্যদিকে কর্মচারীদের মধ্যেও গড়ে উঠেছে শক্তিশালী গ্রুপিং ও সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, কিছু কর্মচারী মামলা-মোকদ্দমা, লবিং ও অভ্যন্তরীণ প্রভাব খাটিয়ে অন্যদের দমিয়ে রাখছেন এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছেন।
বিশেষ করে স্টেনোগ্রাফার, স্টেনো-টাইপিস্ট, প্রধান সহকারী ও উচ্চমান সহকারী পদে কর্মরত কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকেন।

কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক হলেও, সেই পরীক্ষা আয়োজনেও রয়েছে অনিয়ম ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ। কর্মচারীদের দাবি, পরীক্ষা গ্রহণের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি বা নীতিমালা নেই; সবকিছু নির্ভর করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ইচ্ছার ওপর।

কর অঞ্চল-২ এর এক কর্মচারী জানান, তার ১৬ বছরের চাকরি জীবনে বিভাগীয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র দুইবার। এর মধ্যে একবার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না হওয়ায় তিনি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। ফলে পদোন্নতির সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন।

অন্যদিকে কর অঞ্চল-৫ এর এক কর্মচারী জানান, দীর্ঘ চাকরি জীবনেও নিয়মিত বিভাগীয় পরীক্ষা না হওয়ায় অনেক যোগ্য কর্মচারী পদোন্নতির সুযোগ পাচ্ছেন না। তিনি অভিযোগ করেন, পরীক্ষা আয়োজন, ফলাফল প্রকাশ এবং পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের তদবির, লবিং ও অস্বচ্ছতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।

২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর এনবিআরের একটি নোটিশে আয়কর বিভাগের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্য থেকে “কর পরিদর্শক” পদে পদোন্নতির লক্ষ্যে বিভাগীয় পরীক্ষার জন্য আবেদন আহ্বান করা হলেও, আবেদন গ্রহণের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। সর্বশেষ এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৩ সালে।

এদিকে চলতি বছরের ২ মার্চ প্রকাশিত কর পরিদর্শক (১০ম গ্রেড) পদে পদোন্নতির জন্য সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশের পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, বহু কর্মচারী প্রয়োজনীয় বিভাগীয় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় পদোন্নতির তালিকা থেকেও বাদ পড়ার আশঙ্কা করছেন।

কর্মচারীদের একাংশের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল হোতা কর অঞ্চল-১০ এর সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম-কম্পিউটার অপারেটর মোঃ আসাদুজ্জামান। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন কর অঞ্চলের কিছু কর্মচারীকে নিয়ে শক্তিশালী একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন এবং বিভিন্ন মহলে প্রভাব খাটিয়ে বিভাগীয় পরীক্ষা বিলম্বিত করার চেষ্টা করছেন। এছাড়া কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে নিজের পদোন্নতির পথ সুগম করার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এনবিআরে কর্মরত এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ার সুবাদে মো. আসাদুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে বেশ দাপটের সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া থাকায় তিনি বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব খাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ কর্মচারীরা তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও সাহস পান না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. আসাদুজ্জামান সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “এটা তো হাস্যকর। আমি কি দেওয়ার কেউ? আমি সবসময়ই চাই পদোন্নতি তার নিজস্ব গতিতে চলুক। পদোন্নতি কারও করুণা বা দয়া নয়। সময়মতো সবার পদোন্নতি হোক, আমি সেটাই চাই। বরং পদোন্নতি আরও ত্বরান্বিত হোক সেটাই চাই। সুতরাং পদোন্নতি বন্ধ করার প্রশ্নই আসে না।” তিনি আরও বলেন, “অভিযোগ শুনে আমি হাসছি। এনবিআরে কখনো পদোন্নতি বন্ধ করার জন্য কোনো সিন্ডিকেট কাজ করে না।”
বিভাগীয় পরীক্ষা দীর্ঘদিন ধরে অনুষ্ঠিত না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “পরীক্ষা কেন হচ্ছে না, সেটা সংশ্লিষ্ট শাখা ভালো বলতে পারবে। এখানে বাজেট, খাতা-কলম, পরীক্ষা কেন্দ্র ভাড়া—এ ধরনের বিভিন্ন বিষয় জড়িত থাকে।”

অভিযোগ উঠেছে, এনবিআরের অভ্যন্তরে আত্মীয়করণ ও প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতিও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। কর্মচারীদের দাবি, একই পরিবারের একাধিক সদস্য বিভিন্ন কর অঞ্চলে কর্মরত আছেন এবং সুপারিশ ও প্রভাবের মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার বিষয়টিও সবার জানা। ভুক্তভোগী কর্মচারীরা বলছেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মচারীরা চরম হতাশার মধ্যে পড়বেন এবং প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি আস্থা হারাবেন। তারা অবিলম্বে বিভাগীয় পরীক্ষা নিয়মিত আয়োজন, পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং সিন্ডিকেট ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি করেছেন। এ বিষয়ে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

মন্তব্য করুন